‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ – সুজন দেবনাথ

521

এই বয়সের ছেলেরা খুব সহজে যুবতীঘটিত সমস্যায় পড়ে। কিন্তু এ ছেলেটি কোন যুবতীঘটিত সমস্যায় পড়ে নি, পড়েছে যুবকঘটিত সমস্যায়।
সে এক দুষ্ট যুবকের খপ্পরে পড়েছে। শুধু খপ্পরে পড়ে নি, একেবারে দুষ্ট যুবকের চ্যালা হয়ে গেছে।
তার সাথে দিনরাত টো টো করে। তার কথাতেই ওঠে, তার কথাতেই বসে। মা-বাপ মানে না।
দুষ্ট যুবকের সাথে মিশে সে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তাকে সুপথে আনতে বাবা-মা অনেক চেষ্টা করেছেন।
অনেক ঝাড়ফুঁক, তুকতাক করেছেন। কিছুতেই কিছু হয়নি।

ছেলেটির নাম ক্রিতো । আর যে দুষ্ট যুবকটি তাকে নষ্ট করছে, তার নাম সক্রেটিস। সক্রেটিসের বয়স বাইশ। আর ক্রিতো এবার বিশ বছরে পড়লো।
তারা এথেন্স শহরের বাসিন্দা। ইউরোপের দক্ষিণ-পূব কোনে এজিয়ান সাগরের পাড়ে ছিমছাম সুন্দর শহর এথেন্স। এ শহরের উত্তর পাড়ায় তাদের বাড়ি। পাড়াটির নাম এলোপেকি। এই পাড়ার একটি ছোট্ট পাহাড়ের কোলে বড় একটি জলপাই বাগান। সেই বাগানের ফাঁকে ফাঁকে অনেকগুলো বাড়ি। এর মধ্যে যে বাড়িটি সবচেয়ে ছোট – সেটি সক্রেটিসদের। আর যে বাড়িটি সবচেয়ে বড় – সেটি ক্রিতোদের।

বই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’, অন্বেষা প্রকাশন,৩৩ নং প্যাভেলিয়ন (টিএসসির সামনের গেইটের কাছে, গ্লাস টাওয়ারের কাছাকাছি)

ক্রিতোর বাবা বিরাট ধনী মানুষ। এমন ধনী যে – হাত ঝাড়া দিলেই পয়সা পড়ে।
মারাত্মক রকমের ধনীরা বড় বড় সমস্যা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়,
কিন্তু ছোট-খাটো আলতু-ফালতু সমস্যায় খুবই কাহিল হয়ে যায়।
ক্রিতোর পিতাও একটা ফালতু সমস্যায় কাহিল হয়ে গেছেন।
তার ছেলে যুবকঘটিত সমস্যায় জড়িয়ে গেছে। সমস্যার নাম ‘সক্রেটিস সমস্যা’।
সক্রেটিস তার পাশের বাড়ির ছেলে। ছেলেটি কোন কাজের না।
দিনরাত খালি পায়ে টো টো করে ঘোরে। কাজ-কর্ম কিছুই করে না।
বাবা-মা অনেক বুঝায়। কিন্তু বুঝ মানার মতো ছেলে সক্রেটিস না।

ইদানিং সক্রেটিসের একটা রোগ হয়েছে। প্রশ্নরোগ। সে সব বিষয়ে প্রশ্ন করে।
ভীষণ উল্টা-পাল্টা প্রশ্ন। মুরুব্বিরা দেব-দেবী নিয়ে কিছু বললে বিশ্বাস করে না। খালি সন্দেহ করে।
ওর মারাত্মক সন্দেহ বাতিক। সন্দেহ থেকে শুরু করে আজব কিসিমের প্রশ্ন। এক প্রশ্নের থেকে আরেক প্রশ্ন।

আরো পড়ুন: ‘বইয়ের মইদ্যে মধু আছে’ -সুজন দেবনাথ

সফোক্লিস লিখতে বসেছেন

তার লেখার কায়দা কানুন খুবই বাহারী। মাথায় যা আসে পটাপট লিখে ফেলেন। তারপর শুরু করেন সেটুকুর অভিনয়। চিৎকার করে হাসতে হাসতে, কাঁদতে কাঁদতে অভিনয়। অভিনয়ের শব্দে লোক ভীড় করে। রাস্তার মানুষ ভাবে – তার বাড়িতে ঝগড়া লেগেছে, চেঁচামেচি করছে। রাস্তায় লোক দাঁড়িয়ে যায়, তার ঘরে উঁকিঝুঁকি দেয়। একটু শুনেই বুঝে যায় – এতো মিষ্টি গলায় কেউ চেঁচামেচি করে না। এই মধুর গলা এথেন্সের মধুকর সফোক্লিসের। তিনি লিখছেন আর অভিনয় করছেন। তিনি লিখতে বসলেই চারদিক ডাক পড়ে যায়। রাস্তা দিয়ে লোক যায়, আর বলে – বুঝছি – নাট্টকার লিখতে বসেছেন। দুনিয়ার সবথেকে বড় নাটকবিদ কলম হাতে নিয়েছেন।

সফোক্লিসের জীবনে একটাই নেশা। সেটা হলো পুরস্কারের নেশা। তিনি প্রতিবছর ডিওনিসাসের অনুষ্ঠানে প্রথম, না হলে দ্বিতীয় হন। জীবনে কোনদিন তৃতীয় হন নি। কিছুদিন পুরষ্কার না পেলেই তার মনে হয়, লোকে বুঝি তাকে ভুলে গেছে। লোকে যাতে ভুলতে না পারে, সেই নেশায় তিনি দিন-রাত লিখেন।
এবার লিখছেন থিবস শহরের রাজার কাহিনী। এথেন্স থেকে ষাট মাইল উত্তর-পশ্চিমে থিবস শহর। এই শহরের পুরুনো এক রাজার নাম ইদিপাস। ইদিপাসের পরিবারের করুণ কাহিনী সারা পৃথিবীর মানুষের মুখে মুখে। কাহিনীটি ভালো করে বুঝতে সফোক্লিস কদিন আগে থিবস ঘুরে এসেছেন। কাহিনীটা এরকমঃ

থিবসের রাজপুত্র ইদিপাস না জেনে নিজের বাবাকে হত্যা করে রাজা হয় এবং নিজের মাকে বিয়ে করে ফেলে। তাদের ছেলে-মেয়েও হয়। অনেক বছর পরে সত্য পরিচয় জানতে পেরে অনুতাপে ইদিপাস নিজেই অন্ধ হয়ে যায়। তার মা আত্মহত্যা করে। তাদের সন্তানদের সবাই বলে অভিশপ্ত। সন্তানদের জীবনও হয়ে ওঠে ভীষণ করুণ।

বই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’, অন্বেষা প্রকাশন,৩৩ নং প্যাভেলিয়ন (টিএসসির সামনের গেইটের কাছে, গ্লাস টাওয়ারের কাছাকাছি)

এই কাহিনী নিয়ে সফোক্লিস নাটক লিখছেন। নাটকের কাহিনী সবাই জানে। তিনি কাহিনী পাল্টাবেন না। কিন্তু প্লট সাজাচ্ছেন অতি নাটকীয় করে। নতুন থিম দরকার। থিম ঠিক করলেন – মানুষ ভাগ্যের হাতের পুতুল। ইদিপাস রাজাও হয়েও নিয়তিকে ঠেকাতে পারে নি। ভাগ্য ইডিপাসকে নিয়ে খেলেছে। সেরকম পৃথিবীতে সব মানুষই ভ্যগ্যের হাতের খেলনা। সবার জীবনই ইদিপাসের মতো – এমন সময় আসে, যার উপর মানুষের কোন হাত থাকে না। তাই নিজের উপর গর্ব করে লাভ নেই, মানুষের অহংকার করার কিছু নেই। ভাগ্য মানুষকে নিয়ে যেভাবে খুশি খেলতে পারে।

একটু একটু লিখছেন আর অভিনয় করছেন সফোক্লিস। হঠাৎ মনে হলো – ধুর, এই কাহিনী চলবে না। এই সময়ে মানুষ এই কাহিনী খাবে না। এখন এথেন্সে গণতন্ত্রের সুসময় চলছে। গণতন্ত্রের নেতা পেরিক্লিস সবাইকে শিখাচ্ছে – আমাদের ভাগ্য আমাদের হাতে। আমরাই নিজেদের ভাগ্য বানাবো। নিজেদের চেষ্টায় এথেন্সকে পৃথিবীর এক নম্বর বানাবো। সবাই গণতন্ত্র আর নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাসী। এই সময় ভাগ্যের হাতে ইদিপাসের এমন পরিণতি মানুষ পছন্দ করবে না।

বই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’, অন্বেষা প্রকাশন,৩৩ নং প্যাভেলিয়ন (টিএসসির সামনের গেইটের কাছে, গ্লাস টাওয়ারের কাছাকাছি)

নতুন কিছু লিখতে হবে। কিন্তু ইদিপাসের কাহিনী সফোক্লিসের এতো পছন্দ যে – এটা বাদ দিতে তার বুকে চিনচিন ব্যথা লাগছে। নতুন কিছু লেখা তার জন্য ওয়ান-টুর ব্যাপার। কিন্তু মনে হচ্ছে এটা না লিখলে মরা রাজা ইদিপাস খুব মাইন্ড করবে। আজ রাতে ইদিপাস তাকে ফিসফিস করে বলবে, ছি ছি – সফোক্লিস। এই ছিলো তোর মনে? তুই তো লোক সুবিধার না।

মন ঠিক করতে পারছেন না সফোক্লিস। বাড়ির বাইরের দিকে জলপাই বাগানে গেলেন। অনেকক্ষণ চুপচাপ ভাবছেন। হঠাৎ দেখলেন – বাগানের পেছনের রাস্তা দিয়ে একদল লোক একটা লাশ নিয়ে যাচ্ছে।
সফোক্লিস জিজ্ঞেস করলেন, কার লাশ?

সামনের লোকটি উত্তর দিলো, কার লাশ জানি না। ঐ পেনতিলিস পাহাড়ের ধারে পড়ে ছিল। লাশ নিয়ে ঝামেলায় পয়ারে গেছি গো। মরা দেহ তো ফেলে রাখা যাবে না, দেবতারা ক্ষেপে যাবে, পাপ হবে। তাই দাফন দিতে নিয়ে যাচ্ছি।

সফোক্লিস বলে উঠলেন, পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি। এটা তার ইউরেকা মোমেন্ট। ইদিপাসের কাহিনীতে তার ছেলে মেয়েদের লাশ দাফনের কথা আছে। সেই কাহিনীও খুবই করুণ। মরা লাশের কাহিনী লোকে পছন্দ করবে। এটা লিখে ফেলা যায়। এক্ষুণি লিখতে হবে। না হলে মাথা থেকে ছুটে যাবে। তিনি নাচতে নাচতে ঘরের দিকে দৌড় দিলেন।

বই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’, অন্বেষা প্রকাশন,৩৩ নং প্যাভেলিয়ন (টিএসসির সামনের গেইটের কাছে, গ্লাস টাওয়ারের কাছাকাছি)

লাশ বহনকারী লোকেরা অবাক। সফোক্লিসের কী হলো? একজন বললো, কাণ্ডটা দেখছ! একটা মরা লাশ দেখে এমন ডরাইলো? এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেলো? পাশেরজন বললো, ভয় কই পাইলা? হে তো আনন্দে বিড়িং বিড়িং করছে। লাশ দেখে নাচাপিচা করছে, ওনার আর পাগল হতে বেশি দিন লাগব না।
পাগলের মতোই করছিলেন সফোক্লিস। তিনি পেপিরাস নিয়ে বসলেন। ফটাফট লিখতে শুরু করলেন নতুন নাটক। নাম – এন্টিগনি।

এন্টিগনি ইদিপাসের মেয়ে। ইদিপাস অন্ধ হয়ে দূরে চলে গেছে। রাজা হয়েছে তার শ্যালক ক্রিয়ন। ক্রিয়নের কুবুদ্ধিতে ইদিপাসের দুই ছেলে নিজেরা ঝগড়া করে দুজনেই মারা যায়। তাদের একজন ক্রিয়নের পক্ষে ছিলো। তার দেহ দাফন করা হলো। অন্য জন ছিল ক্রিয়নের বিপক্ষে। ক্রিয়ন আদেশ দিলো – বিপক্ষের ছেলের কোন সৎকার হবে না। তার লাশ শিয়াল-কুকুরে খাবে। কিন্তু রুখে দাঁড়ালো এন্টিগনি। সে ক্রিয়নের আদেশ মানবে না। সে দেবতার আদেশ মানবে। দেবতারা সব লাশ সৎকারের নির্দেশ দিয়েছেন।

এন্টিগনি রাতের আঁধারে ভাইকে কবর দিলো। সেই অপরাধে ক্রিয়ন এন্টিগনিকে মৃত্যুদণ্ড দিলো। ক্রিয়নের ছেলে ক্রিয়নকে অনেক বুঝালো, কিন্তু ক্রিয়ন কারো কথা শুনলো না। এন্টিগনি আত্মহত্যা করলো, সেই সাথে আত্মহত্যা করলো ক্রিয়নের একমাত্র ছেলে। ছেলেটি এন্টিগনিকে ভালোবাসতো। ছেলের শোকে আত্মহত্যা করলো ক্রিয়নের স্ত্রী। ক্রিয়ন দেখলো – দুনিয়াতে তার আর আপন কেউ নেই। অন্যায়ের শাস্তি হাতে নাতে পেয়েছে ক্রিয়ন।

ঝড়ের মতো লিখছেন সফোক্লিস

এটা কাহিনীর মত কাহিনী। এই নাটক হিট হবেই। তিনি নাটকে দেখাবেন, ক্রিয়ন একজন একনায়ক, একজন স্বৈরাচার। একনায়করা ভীষণ অহংকারী। এই অহংকারকে গ্রীকরা বলে হুব্রিস। হুব্রিসের কারণে একনায়করা কাউকে মানে না। কারো কথা রাখে না। তাদের পরিণতি হয় ভয়াবহ। গনতন্ত্রের এথেন্সের মানুষ একনায়কের পতন মারাত্মক পছন্দ করবে।
নাটক দেখে তারা বলবে – দেখছ, একনায়করা কতো জঘন্য!
ছিঃ ছিঃ, আর আমাদের গণতন্ত্রের মতো ভাল জিনিস হয় নাকি?

তিনি সংলাপ লিখলেন, যে নগরে একজনের মাত্র শাসন চলে, সেটি কোন নগরই না।
সংলাপটি তার পছন্দ হয়েছে। এই সংলাপে অনেক হাত তালি পাবে। তবু আরো ভালো করে একটু বলা দরকার। ক্রিয়ন নিজেক সংশোধনের কোন চেষ্টাই করে নি। সে একটা গোঁয়ার, এক নম্বরের অহংকারী।
সফোক্লিস লিখলেন, মানুষমাত্রই ভুল করে, কিন্তু যে মানুষ ভুল বুঝতে পারামাত্র সংশোধন করে, সেই হলো ভালো মানুষ। মানুষের একমাত্র অপরাধ অহংকার।

সফোক্লিস দেবতাদের নিয়ে ঠাট্টা করেন না। তিনি মনে করেন – দেবতারা অলিম্পাস পাহাড়ে বসে আরাম করছে। হুদা কামে তাদের রাগানোর কি দরকার। তিনি দেবতাদের নামে ভালো ভালো কথা লিখেন। দেবতাদের নিয়ে উল্টা-পাল্টা লিখে এথেন্সের নাট্টগুরু এস্কিলাসের করুণ পরিণতির কথা তার মনে আছে। এথেন্সের মানুষ নিজে ধর্ম করুক, আর নাই করুক – অন্য কেউ দেবতাদের নিয়ে কিছু বলছে তো – তার অবস্থা কেরোসিন করে দেবে। তাই সফোক্লিস কাউকে চটায় না।

বই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’, অন্বেষা প্রকাশন,৩৩ নং প্যাভেলিয়ন (টিএসসির সামনের গেইটের কাছে, গ্লাস টাওয়ারের কাছাকাছি)

তিনি এন্টিগনির মুখে সংলাপ দিলেন, মানুষের আইনের চেয়ে দেবতার আইন বড়ো।
এই সংলাপটিও তার পছন্দ হলো। মঞ্চে দাঁড়িয়ে গদ্গদ গলায় বলে ফেলা যায়। মানুষ তো ফিদা হয়ে যাবে। নাটক জমে ক্ষীর হয়ে যাবে। তবে একটা সমস্যা হয়েছে। এই নাটক লিখতে গিয়ে কিছু কিছু জায়গায় হেরোডটাসের মতো কথা চলে আসছে। আগে কখনও এমন হয়নি। কয়েকদিন হেরোডটাসের সাথে থেকে এই সমস্যা হয়েছে। হেররোডটাসের গল্প তার মাথায় ঢুকে গেছে। মাথা থেকে সেই গল্প কলমে চলে আসছে। বড়ো ঝামেলা করছে। বার বার কাটতে হচ্ছে।

হেরোডটাস থুরিল শহরে চলে গেছে। সেখানে সে একমনে বই লিখছে। সফোক্লিস ভাবছে – হেরোডটাস বই লিখতে গিয়ে আবার নাটক লিখে ফেলবে না তো?
এথেন্সের মানুষ তার গল্প ভীষণ পছন্দ করেছে। পুরষ্কার দিয়েছে।
হেরোডোটাস নাটক লিখলে, সফোক্লিস ঝামেলায় পড়বে। এক নম্বর নাট্টকারের জায়গা নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। তবে আশার কথা – হেরোডটাস মনে হয় নাটক লিখবে না।
সে বানানো কাহিনী পছন্দ করে না,
সে সত্য কাহিনী লিখবে। সে নতুন কিছু করবে, যেটা পৃথিবীতে কেউ করেনি,
সেটাই করবে হেরোডটাস।
সে তার বইয়ের নাম দিচ্ছে ‘ইতিহাস’।

সফোক্লিস ভাবছে, সেটাই ভালো।

নাটকের যে মাধুর্য, সেটা হেরোডটাস না বুঝলেই ভালো। নাটকে এমন করে মানুষের কথা বলা যায়,
যেন মানুষ সেখানে নিজেকে দেখতে পায়। প্রত্যেক মানুষ নিজেকে নায়ক ভাবতে পারে।
এই কাজে সফোক্লিসই এক নম্বর। পৃথিবীতে তার সামনে দাঁড়ানোর কেউ নেই।
হেরোডটাস চুলায় যাক, সফোক্লিসকে নাটক শেষ করতে হবে।

নাটক দাঁড়িয়ে গেছে। সফোক্লিস খুশি। চমৎকার প্লট। রক্ত, খুন, মারামারি, শাস্তি, দেবতা, গণতন্ত্র সবই আছে। নাটকের শেষটাও চমৎকার।
গ্রীক ট্রাজেডির সব মশলা দেয়া হয়ে গেছে। শুধু ভালোবাসার কথায় একটু ঘাটতি আছে মনে হয়।
ভালোবাসা ছাড়া ট্রাজেডি হয় নাকি। ভালোবাসা ছাড়া কাহিনীই হয় না।

সফোক্লিস এন্টিগনির মুখে সংলাপ দিলেন
– আমি পৃথিবীতে এসেছি ভালোবাসার জন্য, ঘৃণা করার জন্য নয়।
লিখেই চমকে উঠলেন সফোক্লিস। এর চেয়ে ভালো কথা কি হোমারও লিখতে পেরেছে?
জানালার সামনে দাঁড়িয়ে তিন বার অভিনয় করে বললেন সফোক্লিস
– আমি পৃথিবীতে এসেছি ভালোবাসতে, ঘৃণা করতে নয়।
থরথর করে কাঁপছেন সফোক্লিস। এরকম একটি কথা লিখে মরে যাওয়া যায়।
তার মনে হচ্ছে – সেই প্রথম নাটক লিখে যেমন রোমাঞ্চ লেগেছিলো, আজ আবার সেরকম লাগছে।
এটিই হবে তার সেরা নাটক।

বই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’, অন্বেষা প্রকাশন,৩৩ নং প্যাভেলিয়ন (টিএসসির সামনের গেইটের কাছে, গ্লাস টাওয়ারের কাছাকাছি)

এই সেরা লেখাটিকে খুবই যত্ন করে অভিনয় করতে হবে। কোন রকম ফাঁক রাখা যাবে না।
সফোক্লিস ভাবছেন, শুধু দুই জন অভিনেতা এই নাটক জমাতে পারবে না।
গ্রীসের ট্রাজেডিতে এখন পর্যন্ত মাত্র দুই জন অভিনেতা, আর কয়েকজন কোরাস গায়।
নাট্টগুরু এস্কিলাস এই নিয়ম করে গেছেন। এখনও সবাই সেটাই করে।
সফোক্লিস ভাবছেন – শুধু দুইজনে হবে না। কমে করে হলেও তিনজন লাগবে।
সফোক্লিস সিদ্ধান্ত নিলেন, এখন থেকে আমার নাটকে তিনজন করে অভিনেতা থাকবে।

আরো নতুন একটা কাজ করলেন সফোক্লিস। তিনি ছবি আঁকতে বসে গেলেন।
নাটকের দৃশ্য আঁকতে লাগলেন। মঞ্চের পেছনে পর্দা দিয়ে ছবি থাকবে।
প্রতি দৃশ্যের জন্য আলাদা আলাদা ছবি। দৃশ্যের ছবি দিয়ে বুঝিয়ে দিবেন – ঘটনা কোথায় হচ্ছে।
এটাও তার আবিষ্কার। এর আগে কেউ দৃশ্যের জন্য ছবি দেয় নি।
সফোক্লিসের মন অনেক খুশি। চমৎকার একটা নাটক লিখেছেন। নতুন নতুন কায়দা কানুন দৃশ্য
– এসব নিয়ে এবার মঞ্চে উঠবেন তিনি। এবার আর প্রথম হওয়া আটকায় কে?

এখন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ইউরিপিডিস নামে নতুন নাট্টকার। ছেলেটা তার চেয়ে পনের বছররে ছোট। ছেলেটা লিখে ভালো, কিন্তু রক্ত গরম। খালি গরম গরম কথা লিখে। সে দেবতাদের তেমন মানে না। সে মানুষের কথা লিখে।

ইউরিপিডিস নাকি আজকাল সক্রেটিসের সাথে ঘোরে। সক্রেটিস যেমন সব কিছুতে মানুষের কথা বলে, তেমনি ইউরিডিসও সেসব শুরু করছে নাটকের মঞ্চে। সে নাটকে দেবতাদের ভালো ভালো কথা বাদ দিয়ে দেয়,
শুধু মানুষের কথা লিখে। মঞ্চে উঠে নাটক না করে জ্ঞানের কথা কয়, দর্শনের আলাপ করে।
লোকে ঠাট্টা করে বলে – সক্রেটিস হলো রাস্তা-ঘাটের দার্শনিক আর ইউরিপিডিস হলো রঙ্গমঞ্চের দার্শনিক। দুজনেই বেহুদা লাফায়।
সফোক্লিস তাদের লাফালাফি মনে করে হাসলেন। তার নাটক রেডি হয়ে গেছে। এবার দুই চ্যাংড়া লাফাতে থাকুক – সক্রেটিস রাস্তায়, ইউরিপিডিস থিয়েটারে।

(হেমলকের নিমন্ত্রণ’ উপন্যাসের অংশবিশেষ)
লেখক: ফাস্ট সেক্রেটারী, বাংলাদেশ দূতাবাস, এথেন্স, গ্রিস

Leave A Reply

Please enter your comment!
Please enter your name here